অনলাইন ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স করতে হয় আপনার ব্যবসার ঠিকানা যে এলাকায়, সেখানকার সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। সাধারণত লাগে জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি আর ব্যবসার ঠিকানার প্রমাণ (ভাড়ার চুক্তি বা হোল্ডিং ট্যাক্সের রশিদ); ফি ব্যবসার ধরন আর এলাকা অনুযায়ী আলাদা, আর প্রতি অর্থবছরে নবায়ন করতে হয়। ট্রেড লাইসেন্স হাতে পেলে চাইলে ই-ক্যাব (ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ)-এর সদস্য হতে পারেন আর DBID নিতে পারেন — দুটোতেই সাধারণত ট্রেড লাইসেন্স লাগে।
"ফেসবুক পেজে বিক্রি করি, আমার আবার লাইসেন্স কেন?" — নতুন অনলাইন উদ্যোক্তাদের খুব সাধারণ প্রশ্ন। শুরুতে অনেকে কাগজপত্র ছাড়াই চালান, কিন্তু ব্যবসা একটু বড় হলেই দেখা যায় পেমেন্ট গেটওয়ে, মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি — সব জায়গায় ট্রেড লাইসেন্স চাওয়া হচ্ছে। এই লেখায় আমরা দেখাব ট্রেড লাইসেন্স কোথা থেকে করবেন, কী কাগজ লাগে, কীভাবে আবেদন করবেন, আর ই-ক্যাব ও DBID কী কাজে লাগে।
এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য, আইনি পরামর্শ নয়। ফি, কাগজের তালিকা আর আবেদনের পদ্ধতি এলাকা ভেদে আলাদা এবং সময়ে সময়ে বদলায় — আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নিন।
এই লেখায় যা আছে
অনলাইন ব্যবসায় ট্রেড লাইসেন্স কেন লাগে
ট্রেড লাইসেন্স হলো স্থানীয় সরকারের দেওয়া অনুমতিপত্র, যা প্রমাণ করে আপনি একটি নির্দিষ্ট ঠিকানা থেকে একটি নির্দিষ্ট ধরনের ব্যবসা করছেন। দোকান না থাকলেও অনলাইন ব্যবসা একটি ব্যবসা — তাই একই নিয়ম প্রযোজ্য। বাস্তবে যেসব কাজে এটা লাগে:
- পেমেন্ট গেটওয়ে ও মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট: বিকাশ মার্চেন্ট, SSLCommerz-এর মতো গেটওয়ের আবেদনে প্রায় সব সময় চাওয়া হয়। বিস্তারিত পড়ুন ওয়েবসাইটে বিকাশ পেমেন্ট নেওয়ার নিয়ম লেখায়।
- ব্যবসার নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট: প্রতিষ্ঠানের নামে অ্যাকাউন্ট খুলতে লাগে।
- ই-ক্যাব সদস্যপদ ও DBID: দুটোর আবেদনেই সাধারণত লাগে।
- কুরিয়ার, সাপ্লায়ার বা করপোরেট গ্রাহকের সাথে চুক্তি: অনেক প্রতিষ্ঠান লিখিত চুক্তির আগে দেখতে চায়।
- গ্রাহকের আস্থা: ওয়েবসাইটে লাইসেন্স নম্বর দেখালে মানুষ বোঝেন আপনি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান।
অনলাইন ব্যবসার অন্য কাগজপত্র — TIN, ভ্যাট, ডিজিটাল কমার্স নির্দেশিকা — এক জায়গায় দেখতে পড়ুন অনলাইন ব্যবসার আইনি কাগজপত্রের পূর্ণ তালিকা।
কোথা থেকে করবেন
ট্রেড লাইসেন্স দেয় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, আর কোন অফিস থেকে নেবেন তা নির্ভর করে আপনার ব্যবসার ঠিকানার ওপর:
| ব্যবসার ঠিকানা | যেখান থেকে ট্রেড লাইসেন্স |
|---|---|
| সিটি কর্পোরেশন এলাকা (যেমন ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা) | সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন — অনেক জায়গায় অনলাইনে আবেদন করা যায় |
| পৌরসভা এলাকা | সংশ্লিষ্ট পৌরসভা |
| গ্রাম/ইউনিয়ন | ইউনিয়ন পরিষদ |
ঘরে বসে ব্যবসা করলে সাধারণত বাসার ঠিকানাই ব্যবসার ঠিকানা হয়। ভাড়া বাসা হলে বাড়ির মালিকের সম্মতি বা ভাড়ার চুক্তি লাগতে পারে।
কী কী কাগজ লাগে
একক মালিকানার ছোট অনলাইন ব্যবসার জন্য সাধারণত নিচের কাগজগুলো চাওয়া হয়। অংশীদারি বা কোম্পানি হলে বাড়তি কাগজ লাগে।

ব্যবসার নাম আগে ঠিক করুন: ট্রেড লাইসেন্সে যে নাম দেবেন, সেই নামই পরে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, পেমেন্ট গেটওয়ে, ফেসবুক পেজ আর ওয়েবসাইটে ব্যবহার করুন। সব জায়গায় একই নাম থাকলে যাচাই দ্রুত হয়।
ধাপে ধাপে আবেদন

- অফিস চিনুন: আপনার ঠিকানা কোন ওয়ার্ড বা ইউনিয়নে পড়ে দেখে নিন। সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অনলাইন আবেদনের ব্যবস্থা আছে কি না তাদের ওয়েবসাইটে দেখুন।
- ব্যবসার ধরন ঠিক করুন: আবেদনে ব্যবসার ধরন বা ক্যাটাগরি বাছতে হয়। অনলাইনে পণ্য বিক্রি করলে আপনার পণ্যের ধরন অনুযায়ী (যেমন পোশাক, খাবার, সাধারণ পণ্য) ঠিক ক্যাটাগরি জেনে নিন — ফি এর ওপর নির্ভর করে।
- ফর্ম পূরণ ও কাগজ জমা: অনলাইনে হলে স্ক্যান করা কপি আপলোড, অফিসে হলে সত্যায়িত কপি জমা।
- ফি পরিশোধ: লাইসেন্স ফি, সাইনবোর্ড কর (প্রযোজ্য হলে) আর অন্যান্য চার্জ — রশিদ অবশ্যই রাখুন।
- যাচাই ও লাইসেন্স: যাচাই শেষে লাইসেন্স দেওয়া হয়; অনলাইন ব্যবস্থায় অনেক সময় ডাউনলোড করা যায়।
ফি আর নবায়ন
ট্রেড লাইসেন্সের ফি নির্দিষ্ট একটি অঙ্ক নয়; ব্যবসার ধরন, মূলধন আর এলাকা অনুযায়ী আলাদা হয়, সাথে সাইনবোর্ড কর বা অন্যান্য চার্জ যোগ হতে পারে। তাই কারও মুখে শোনা অঙ্কের ওপর নির্ভর না করে অফিস বা তাদের ওয়েবসাইটের তালিকা দেখুন।
ট্রেড লাইসেন্স সাধারণত এক অর্থবছরের (জুলাই থেকে জুন) জন্য বৈধ থাকে, আর প্রতি বছর নবায়ন করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের পর নবায়ন করলে জরিমানা হতে পারে। মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স দিয়ে গেটওয়ে বা ব্যাংকের কাজ আটকে যায় — তাই নবায়নের তারিখ ক্যালেন্ডারে লিখে রাখুন।
ই-ক্যাব কী, সদস্য হবেন কেন
ই-ক্যাব (e-Commerce Association of Bangladesh) বাংলাদেশের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বাণিজ্য সংগঠন। সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়, তবে অনেক উদ্যোক্তা যেসব কারণে সদস্য হন:
- অন্য উদ্যোক্তা, কুরিয়ার, পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে পরিচয় আর নেটওয়ার্ক
- প্রশিক্ষণ, মেলা ও আয়োজনে অংশ নেওয়ার সুযোগ
- কিছু প্রতিষ্ঠান অংশীদারত্ব বা সুবিধার জন্য সদস্যপদ দেখতে চায়
- খাতের নিয়মকানুনের খবর দ্রুত পাওয়া
সদস্যপদের সাধারণ ধাপ
ই-ক্যাবের ওয়েবসাইটে সদস্যপদের ফর্ম পূরণ করতে হয়, সাধারণত ট্রেড লাইসেন্স, জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি আর ব্যবসার ওয়েবসাইট বা পেজের তথ্য দিয়ে; তারপর নির্ধারিত ফি দিতে হয়। সদস্যপদের শ্রেণি, ফি আর কাগজের সর্বশেষ তালিকা ই-ক্যাবের নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে দেখে নিন।
DBID: অনলাইন বিক্রেতার পরিচয় নিবন্ধন
DBID (ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি) হলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থায় অনলাইন বিক্রেতাদের পরিচয় নিবন্ধন, যার উদ্দেশ্য অনলাইন কেনাকাটায় বিক্রেতাকে শনাক্তযোগ্য আর গ্রাহককে নিরাপদ রাখা। আবেদনে সাধারণত ট্রেড লাইসেন্স আর পরিচয়ের তথ্য লাগে। কারা নেবেন আর কীভাবে আবেদন করবেন, বিস্তারিত আছে DBID কী ও নেওয়ার নিয়ম লেখায়।
লাইসেন্স হাতে পাওয়ার পর
- ব্যাংক অ্যাকাউন্ট: ব্যবসার নামে অ্যাকাউন্ট খুলুন, ব্যক্তিগত আর ব্যবসার টাকা আলাদা রাখুন।
- পেমেন্ট গেটওয়ে: এখন SSLCommerz বা মার্চেন্ট গেটওয়ের আবেদন করতে পারেন — ধাপগুলো আছে SSLCommerz অ্যাকাউন্ট খোলার নিয়ম লেখায়।
- ওয়েবসাইটে তথ্য দিন: "আমাদের সম্পর্কে" বা ফুটারে ব্যবসার নাম, ঠিকানা আর ট্রেড লাইসেন্স নম্বর দিলে গ্রাহকের আস্থা বাড়ে।
- TIN ও কর: আয় বাড়লে কর-সংক্রান্ত কাজ শুরু করুন — দেখুন অনলাইন ব্যবসায় TIN ও ভ্যাট।
যে ভুলগুলো সময় নষ্ট করে
- ভুল ক্যাটাগরি বাছা: লাইসেন্সে ব্যবসার ধরন আর আপনার আসল ব্যবসা না মিললে পরে গেটওয়ে বা ব্যাংকের যাচাইয়ে প্রশ্ন ওঠে।
- নামের বানান আলাদা: লাইসেন্সে এক বানান, ব্যাংকে আরেক, ওয়েবসাইটে তৃতীয় — এতে কাগজ মেলাতে সময় যায়।
- দালালের ওপর পুরো নির্ভরতা: কাউকে দিয়ে করালেও নিজে রশিদ আর লাইসেন্সের কপি দেখে নিন, অনলাইন ব্যবস্থায় যাচাই করা গেলে যাচাই করুন।
- কপি না রাখা: লাইসেন্স, রশিদ আর জমা দেওয়া কাগজের স্ক্যান কপি ক্লাউডে রাখুন; প্রতি বছর নবায়ন আর নানা আবেদনে বারবার লাগবে।
ওয়েবসাইটে অর্ডার, পেমেন্ট আর ডেলিভারি সাজানোর গাইডগুলো পাবেন Metanoz হেল্প সেন্টারের বিক্রি অংশে।
নিজের ওয়েবসাইট আজই শুরু করুন
টেমপ্লেট বেছে নিন, নাম দিন — বাকিটা Metanoz সাজিয়ে দেবে। ৭ দিন বিনামূল্যে, কার্ড লাগবে না।
বিনামূল্যে শুরু করুনটেমপ্লেট দেখুনসচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
শুধু ফেসবুকে বিক্রি করলেও কি ট্রেড লাইসেন্স লাগবে?
ব্যবসা যেখানেই হোক, নিয়মিত পণ্য বিক্রি করলে সেটা ব্যবসা। ছোট পরিসরে শুরুতে অনেকে লাইসেন্স ছাড়া চালান, কিন্তু পেমেন্ট গেটওয়ে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা চুক্তির জন্য লাইসেন্স লাগবেই — তাই শুরুতেই করে রাখা ভালো।
বাসার ঠিকানায় কি ট্রেড লাইসেন্স করা যায়?
সাধারণত যায়, বিশেষ করে ঘরে বসে চালানো অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রে। ভাড়া বাসা হলে ভাড়ার চুক্তি বা মালিকের সম্মতি লাগতে পারে। আপনার এলাকার অফিস থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।
ট্রেড লাইসেন্স পেতে কত দিন লাগে?
অফিস আর কাগজপত্র ঠিক থাকার ওপর নির্ভর করে। অনলাইন আবেদনে অনেক সময় দ্রুত হয়, তবে যাচাইয়ে কিছু দিন লাগতে পারে। সব কাগজ একসাথে গুছিয়ে আবেদন করলে সময় কম লাগে।
ই-ক্যাবের সদস্য হওয়া কি বাধ্যতামূলক?
না, এটা একটি বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যপদ। নেটওয়ার্ক, প্রশিক্ষণ আর খাতের খবরের জন্য অনেকে সদস্য হন; কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধা দেওয়ার সময় সদস্যপদ দেখতে চায়।
ট্রেড লাইসেন্স কি প্রতি বছর নবায়ন করতে হয়?
হ্যাঁ, সাধারণত প্রতি অর্থবছরে। দেরিতে নবায়ন করলে জরিমানা হতে পারে, আর মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স দিয়ে ব্যাংক বা গেটওয়ের কাজ আটকে যায়।
ওয়েবসাইট বানাতে কি ট্রেড লাইসেন্স লাগে?
না। Metanoz-সহ বেশিরভাগ ওয়েবসাইট বিল্ডারে লাইসেন্স ছাড়াই ওয়েবসাইট বানানো আর বিকাশ-নগদ নম্বরে পেমেন্ট নেওয়া যায়। তবে নিজের SSLCommerz বা মার্চেন্ট গেটওয়ে যুক্ত করতে চাইলে সেই প্রতিষ্ঠানের আবেদনে লাইসেন্স লাগবে।
E-commerce Rules in Bangladesh: What Online Sellers Must Know
ভোক্তা অধিকার আর অনলাইন বিক্রেতা: যে নিয়মগুলো জানা জরুরি
Trade Licence for an Online Business in Bangladesh: Papers, Steps, Fees