অনলাইনে পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে আগে প্রতি অর্ডারের পুরো খরচ বের করুন: কেনা দাম + প্যাকেজিং + ডেলিভারিতে আপনার ভর্তুকি + COD বা পেমেন্ট চার্জ + রিটার্নের ক্ষতির ভাগ + প্রতি অর্ডারে বিজ্ঞাপন খরচ + ভাড়া-ফোনের মতো খরচ। তারপর যে লাভ চান সেটা যোগ করুন, আর মিলিয়ে দেখুন সবচেয়ে বড় ছাড় দিলেও আর ঢাকার বাইরে পাঠালেও লাভ থাকে কি না। শুধু কেনা দামের ওপর একটা অঙ্ক বসিয়ে দাম ঠিক করলে বিক্রি বাড়লেও মাস শেষে লাভ থাকে না।
অনলাইন ব্যবসায় সবচেয়ে প্রচলিত ভুলগুলোর একটা হলো "কেনা দাম ৫০০, বিক্রি ৮০০ — লাভ ৩০০" ধরে নেওয়া। বাস্তবে সেই ৩০০ টাকা থেকে বিজ্ঞাপন, প্যাকেট, কুরিয়ার, ফেরত আসা পার্সেল আর ছোটখাটো খরচ কেটে যায়। অনেকে তাই মাসে শতাধিক অর্ডার পাঠিয়েও বুঝতে পারেন না টাকা কোথায় গেল। এই লেখায় একটা সহজ হিসাব দেখাব, যেটা খাতায় বা ফোনের ক্যালকুলেটরে করা যায়, আর দাম দেখানোর কিছু সৎ কৌশল।
লেখার সব অঙ্ক উদাহরণ, কোনো বাজারদর নয়। কুরিয়ার ও পেমেন্টের আসল চার্জ প্রতিষ্ঠানের সাথে মিলিয়ে নিন (অক্টোবর ২০২৬)।
এই লেখায় যা আছে
প্রতি অর্ডারের খরচের তালিকা
পণ্যের দাম ঠিক করার আগে একটা অর্ডার আপনার কাছে কত টাকা খরচ করায়, সেটা লিখে ফেলুন। প্রতিটি ঘর খালি না রেখে আন্দাজ হলেও একটা অঙ্ক বসান:
- কেনা বা বানানোর দাম: পাইকারি দাম, সাথে দোকান পর্যন্ত আনার খরচ।
- প্যাকেজিং: পলি, বক্স, টেপ, ধন্যবাদ কার্ড — ছোট মনে হলেও প্রতি অর্ডারে যোগ হয়।
- ডেলিভারি: ক্রেতার কাছ থেকে যে চার্জ নেন আর কুরিয়ারকে যা দেন, তার পার্থক্য। ফ্রি ডেলিভারি দিলে পুরোটাই আপনার খরচ।
- COD ও পেমেন্ট চার্জ: অনেক কুরিয়ার ক্যাশ অন ডেলিভারির টাকা সংগ্রহের জন্য আলাদা চার্জ রাখে; কার্ড বা গেটওয়ে পেমেন্টেও সাধারণত চার্জ থাকে। হার নিজের কুরিয়ার ও গেটওয়ের সাথে নিশ্চিত করুন।
- রিটার্ন: যে পার্সেল ফেরত আসে, তার যাওয়া-আসার চার্জ আর নষ্ট প্যাকেট আপনার ক্ষতি। এই ক্ষতি সফল অর্ডারগুলোর ওপর ভাগ করে ধরুন।
- বিজ্ঞাপন: মাসের বিজ্ঞাপন খরচ ÷ সেই বিজ্ঞাপন থেকে আসা অর্ডার।
- চলমান খরচ: ঘরভাড়া, কর্মীর বেতন, ফোন-ইন্টারনেট, ওয়েবসাইটের মাসিক খরচ — মাসের মোট ÷ মাসের অর্ডার।
ফেরত কমানোর উপায় নিয়ে বিস্তারিত আছে COD অর্ডারে রিটার্ন কমানোর নিয়ম লেখায় — রিটার্ন কমলে দাম না বাড়িয়েও লাভ বাড়ে।
একটি উদাহরণ হিসাব
ধরা যাক আপনি একটি সুতি থ্রি-পিস বিক্রি করেন। নিচের অঙ্কগুলো কাল্পনিক, শুধু হিসাবের ধরন দেখানোর জন্য:
- কেনা দাম ৳৫৫০, প্যাকেজিং ৳৩০।
- ডেলিভারি: ক্রেতার কাছ থেকে যা নেন, কুরিয়ারে খরচ তার চেয়ে গড়ে ৳২০ বেশি পড়ে — এটা আপনার ভর্তুকি।
- COD চার্জ: ধরা যাক প্রতি অর্ডারে ৳১৫।
- রিটার্ন: ১০০টি অর্ডারে ২০টি ফেরত এলো, প্রতিটিতে যাওয়া-আসা আর প্যাকেট মিলিয়ে ৳১৫০ ক্ষতি = ৳৩,০০০। সফল ৮০টি অর্ডারে ভাগ করলে প্রতি অর্ডারে প্রায় ৳৪০।
- বিজ্ঞাপন: মাসে ৳৩,০০০ খরচে ২৫টি অর্ডার এলে প্রতি অর্ডারে ৳১২০।
- চলমান খরচ: ভাড়া, ফোন আর অন্যান্য মিলিয়ে প্রতি অর্ডারে ৳৫০।
মোট খরচ দাঁড়ায় ৳৮২৫। ৳৮০০-তে বিক্রি করলে প্রতিটি অর্ডারে আসলে লোকসান। ৳১,০৫০ রাখলে লাভ ৳২২৫ — মানে বিক্রির দামের প্রায় ২১%।

দাম বের করার সহজ সূত্র
যদি বিক্রির দামের একটা নির্দিষ্ট অংশ লাভ হিসেবে চান, তাহলে: দাম = মোট খরচ ÷ (১ − লাভের হার)। যেমন খরচ ৳৮২৫, লাভ চান ২০% → ৮২৫ ÷ ০.৮০ = ৳১,০৩১, যা গোল করে ৳১,০৫০ রাখা যায়। এরপর বাজারের সাথে মিলিয়ে দেখুন — একই মানের পণ্য যদি অনেক কমে পাওয়া যায়, তাহলে হয় খরচ কমানোর পথ খুঁজুন (কম রিটার্ন, ভালো বিজ্ঞাপন), নয়তো পণ্যের মান আর সেবা দিয়ে বেশি দামের কারণ দেখান।
প্রতি মাসে একবার আসল অঙ্ক দিয়ে হিসাবটা আবার করুন। বিজ্ঞাপনের খরচ আর রিটার্নের হার মাসে মাসে বদলায়, বিশেষ করে ঈদ আর রমজানের মৌসুমে।
ফ্রি ডেলিভারি দেবেন কি
"ফ্রি ডেলিভারি" লেখা দেখলে অনেক ক্রেতা আকৃষ্ট হন, কিন্তু খরচটা কোথাও না কোথাও আপনাকেই দিতে হয়। তিনটি পথ আছে:

- চার্জ আলাদা: পণ্যের দাম কম দেখায়, হিসাব পরিষ্কার। ঢাকার ভিতরে আর বাইরে আলাদা চার্জ লিখে দিন।
- সবসময় ফ্রি: চার্জটা পণ্যের দামে ঢুকিয়ে দিতে হয়। হালকা আর বেশি লাভের পণ্যে চলে, কিন্তু ঢাকার বাইরের অর্ডারে লোকসানের ঝুঁকি বাড়ে।
- নির্দিষ্ট অঙ্কের ওপর ফ্রি: যেমন "৳১,৫০০-এর বেশি কিনলে ডেলিভারি ফ্রি"। এতে ক্রেতা আরেকটা পণ্য যোগ করতে উৎসাহী হন, গড় অর্ডারের আকার বাড়ে। বেশিরভাগ দোকানের জন্য এটাই ভারসাম্যপূর্ণ।
এলাকা অনুযায়ী চার্জ কীভাবে ঠিক করবেন, তা আছে ডেলিভারি চার্জ ঠিক করার নিয়ম লেখায়।
ছাড় ও কুপন: লাভ না হারিয়ে
ছাড় বিক্রি বাড়ায়, কিন্তু ভুল হিসাবে ছাড় দিলে যত বেশি বিক্রি, তত বেশি লোকসান। কয়েকটি নিয়ম:
- আগে হিসাব, পরে ছাড়: উদাহরণের পণ্যে লাভ ৳২২৫। ২০% ছাড় মানে ৳২১০ কম — প্রায় পুরো লাভ শেষ। তাই ছাড়ের অঙ্ক লাভের ভেতরে রাখুন।
- শতাংশের বদলে নির্দিষ্ট টাকা: "৳১০০ ছাড়" বা "দ্বিতীয়টায় ৳১৫০ কম" হিসাব রাখা সহজ।
- শর্তসহ কুপন: ন্যূনতম অর্ডারের অঙ্ক, শেষ তারিখ আর কতবার ব্যবহার করা যাবে — ঠিক করে দিন।
- পুরনো ক্রেতার জন্য আলাদা: নতুন ক্রেতা টানার চেয়ে পুরনো ক্রেতাকে ফিরিয়ে আনা সাধারণত সস্তা। দ্বিতীয় অর্ডারের কুপন ভালো কাজ করে।
- বান্ডেল: দুটি বা তিনটি পণ্য একসাথে একটু কম দামে। প্যাকেজিং আর কুরিয়ার একবারই লাগে, তাই খরচও কমে।
দাম দেখানোর কৌশল
একই দাম কীভাবে দেখাচ্ছেন, তাতেও ক্রেতার সিদ্ধান্ত বদলায়। সৎ থেকে যা করা যায়:
- দাম লুকাবেন না: "দাম জানতে ইনবক্স করুন" অনেক ক্রেতাকে ফিরিয়ে দেয়। ওয়েবসাইটে আর পোস্টে দাম পরিষ্কার লিখুন।
- মোট খরচ আগে জানান: ডেলিভারি চার্জ চেকআউটে হঠাৎ যোগ হলে অনেকে অর্ডার শেষ করেন না। পণ্যের পাতাতেই চার্জ লিখে দিন।
- কাটা দাম শুধু সত্যি হলে: "আগের দাম ৳১,৫০০, এখন ৳৯৯০" — শুধু তখনই লিখুন, যদি সত্যিই আগে ওই দামে বিক্রি করতেন। বানানো আগের দাম ক্রেতার সাথে প্রতারণা, আর ভোক্তা অধিকারের দিক থেকেও ঝুঁকি।
- সাইজ বা পরিমাণ অনুযায়ী দাম: বড় সাইজ বা বেশি পরিমাণে আলাদা দাম থাকলে প্রতিটির দাম পাশাপাশি দেখান।
- দামের পাশে মূল্য বোঝান: কাপড়ের মান, ওজন, ওয়ারেন্টি, ফেরতের সুযোগ — এগুলো লিখলে বেশি দামের কারণ বোঝা যায়। কীভাবে লিখবেন তা আছে পণ্যের বিবরণ লেখার নিয়মে।

দাম ঠিক করতে যে ভুলগুলো হয়
- প্রতিযোগীর দেখাদেখি দাম: তাঁর খরচ, রিটার্নের হার আর বিজ্ঞাপনের বাজেট আপনার মতো নয়। নিজের হিসাব থেকে শুরু করুন।
- সব পণ্যে একই লাভ: ভারী, ভঙ্গুর বা বেশি ফেরত আসা পণ্যে বেশি খরচ, তাই বেশি লাভ রাখতে হয়।
- নিজের সময়কে শূন্য ধরা: নিজে প্যাক করছেন, ইনবক্সে উত্তর দিচ্ছেন — এই সময়েরও দাম আছে, ব্যবসা বড় হলে সেটা কর্মীর বেতন হয়ে দাঁড়ায়।
- ঘন ঘন দাম বদলানো: প্রতি সপ্তাহে দাম ওঠানামা করলে ক্রেতা অপেক্ষা করতে শেখেন।
দাম, কুপন আর ডেলিভারি চার্জ এক জায়গায়
হিসাব ঠিক হলেও সেটা প্রতিটি পণ্যে, কুপনে আর ডেলিভারি চার্জে একভাবে বসানো দরকার। Metanoz-এর Business প্ল্যানে (দাম জানতে যোগাযোগ করুন) অনলাইন দোকানে পণ্যের দাম ও আগের দাম, কুপন কোড আর এলাকা অনুযায়ী ডেলিভারি চার্জ একই অ্যাডমিন থেকে ঠিক করা যায়, আর ক্রেতা চেকআউটে এলাকা বাছলেই সঠিক চার্জ যোগ হয়। হিসাবের জন্য অ্যাকাউন্টিং অ্যাপে অর্ডার আর খরচ এক খাতায় রাখা যায়। দাম ও ছবিসহ পণ্য কীভাবে যোগ করবেন, তা আছে পণ্য যোগ করার হেল্প গাইডে; দোকানের বাকি ফিচার দেখুন অনলাইন স্টোরের ফিচার পেজে।
নতুন করে দোকান শুরু করলে আগে পড়ে নিন অনলাইন দোকান খোলার নিয়ম।
এবার কী করবেন
আপনার সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া তিনটি পণ্য নিন আর ওপরের তালিকা ধরে প্রতিটির পুরো খরচ লিখুন। যেটায় লাভ সবচেয়ে কম বা লোকসান, সেটার দাম, ডেলিভারি নিয়ম বা বিজ্ঞাপন আগে ঠিক করুন। তারপর ওয়েবসাইটে দাম আর ডেলিভারি চার্জ পরিষ্কার করে লিখে দিন।
নিজের ওয়েবসাইট আজই শুরু করুন
টেমপ্লেট বেছে নিন, নাম দিন — বাকিটা Metanoz সাজিয়ে দেবে। ৭ দিন বিনামূল্যে, কার্ড লাগবে না।
বিনামূল্যে শুরু করুনটেমপ্লেট দেখুনসচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
পণ্যের দাম নির্ধারণে কত শতাংশ লাভ রাখা উচিত?
একটা নির্দিষ্ট শতাংশ সব ব্যবসায় খাটে না। আগে প্রতি অর্ডারের সব খরচ বের করুন, তারপর এমন লাভ রাখুন যাতে সবচেয়ে বড় ছাড়, ঢাকার বাইরের ডেলিভারি আর রিটার্ন বাদ দিয়েও কিছু থাকে।
ফ্রি ডেলিভারি দিলে কি বিক্রি বাড়ে?
অনেক সময় বাড়ে, কিন্তু খরচটা দামে বা লাভ থেকে দিতে হয়। নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি অর্ডারে ফ্রি ডেলিভারি দিলে বিক্রি আর গড় অর্ডার দুটোই বাড়ার সুযোগ থাকে, ঝুঁকিও কম।
প্রতিযোগী কম দামে বিক্রি করলে কী করব?
দাম কমানোর আগে দেখুন আপনার খরচ কোথায় বেশি — রিটার্ন, বিজ্ঞাপন না কেনা দাম। খরচ কমানো না গেলে মান, ছবি, বিবরণ, দ্রুত ডেলিভারি আর ফেরতের সুবিধা দিয়ে বেশি দামের কারণ দেখান।
দাম কি ৳৯৯০-এর মতো রাখা ভালো?
অনেক বিক্রেতা রাখেন, আর অনেক ক্রেতার কাছে এটা কম মনে হয়। তবে আসল বিষয় হলো পুরো হিসাবে লাভ থাকা; দাম ৳৯৯০ না ৳১,০০০, সেটা দ্বিতীয় ধাপের প্রশ্ন।
ঢাকার ভিতরে আর বাইরে কি আলাদা দাম রাখব?
পণ্যের দাম এক রেখে ডেলিভারি চার্জ আলাদা রাখাই সবচেয়ে পরিষ্কার। পণ্যের দামে পার্থক্য করলে ক্রেতা বিভ্রান্ত হন।
কাটা দাম (আগের দাম) দেখানো কি বৈধ?
আগের দাম সত্যিই সেটা হলে দেখানো যায়। বানানো আগের দাম দেখিয়ে ছাড় বোঝানো ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করে, এবং ভোক্তা অধিকার আইনের দিক থেকেও সমস্যা হতে পারে।
অনলাইন ব্যবসা শুরু করার নিয়ম: শূন্য থেকে প্রথম অর্ডার পর্যন্ত (২০২৬)
Selling Abroad from Bangladesh: Payments, Shipping, Currency and Language
How to Build an E-commerce Website in Bangladesh (Step by Step)